পাতা

অফিস সম্পর্কিত

                পীর খানজাহান (রাঃ)-এর পূণ্যস্মৃতি বিজড়িত, উত্তাল বঙ্গোপসাগর বিধৌত সুন্দরী সুন্দরবন সুশোভিত বন্দর নগরী খুলনাতে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পবিত্র স্মৃতি ভাস্কর্যের গৌরব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খুলনা বেতার। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে ১৯৭০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর খুলনা বেতারের গৌরবময় যাত্রা শুরু হয় গল্লামারীতে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সেদিন আবেগের শিহরণে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিল ইথারে ভেসে আসা শব্দাবলী। ধাতস্থ হতে হয়তবা কিছুটা সময়ও লেগেছিল। তারপরই উপলব্ধি করতে পেরেছিল-আমাদের নিজস্ব একটি বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খুলনার গল্লামারীতে। শহর থেকে সরু একটি পথ ধূ-ধূ মাঠ পেরিয়ে এঁকে বেঁকে এসে মিশেছে যেখানে, সেখানেই ছিল খুলনা বেতার কেন্দ্রের প্রথম ভবনটি। বর্তমানে এটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন। সন্ধ্যা হলেই নীরব-নিথর আর অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলত চতুর্দিকে ফাঁকা এ ভবনটিকে। লোক চলাচল যেত বন্ধ হয়ে। সেই বিপদ সংকূল স্থানে বেতারের শিল্পী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, কলাকুশলী যেত নানা বিপদ মাথায় নিয়ে। কেন্দ্রটি চালু হওয়ার ৩ মাসের মধ্যেই দেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।

                খুলনা বেতারের প্রথম ট্রান্সমিটার ছিল ১০ কিলোওয়াট শক্তি বিশিষ্ট। প্রথম আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন এম. ইব্রাহিম আখন্দ। তাঁর নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ নিবেদিত কর্মী-বেতারকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য তাদের সর্বশক্তি ও মেধা প্রয়োগ করেন। অনুষ্ঠান প্রযোজকদের মধ্যে ছিলেন জনাব সামছুর আলী বিশ্বাস, মুন্সি আহসান কবীর, শেখ ওয়ালিউর রহমান প্রমুখ। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন অনুষ্ঠান সংগঠক গোলাম কবির ও কাজী মাহমুদুর রহমান। অধিবেশন তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মাহ্মুদ হাসান ও জনাব আব্দুর রহিম। সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন জনাব আব্দুল মালেক। সংবাদ অনুবাদক ও পাঠকদের মধ্যে ছিলেন লিয়াকত আলী, আহমদ আলী খান ও হুমায়ুন কবির বালু। প্রথম সঙ্গীত প্রযোজক ছিলেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, সৈয়দ নুরুল ইসলাম মুফতি ও আব্দুল মজিদ। প্রথম নাট্য প্রযোজক ছিলেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন।

                প্রথমে প্রায় ৪০ জন সঙ্গীত শিল্পী আর ২০ জন নাট্যশিল্পী নিয়ে খুলনা বেতারের যাত্রা শুরু হয়। কথকও ছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন আহসান আরা রুমী, জেবুন্নেসা বেগম, সেলিনা, বিলকিস আনার, শেখ আব্দুস সালাম, শেখ বজলার রহমান ও শাহ্ মোহাম্মদ ইয়াসীন। যন্ত্র সঙ্গীতে ছিলেন শেখ আলী আহম্মেদ, দুলাল চন্দ্র শীল, ফজলে আকবর, মোঃ সাদ্তকী, আব্দুল মজিদ।

                অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে খুলনা বেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন কনে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে খুলনা বেতার রেডিও পাকিস্তান নামটি বর্জন করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে একাতœতা ঘোষণা করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর রচিত গান প্রচার করতে থাকে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনির পরিবর্তে জয় বাংলা ধ্বনি প্রচার করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গল্লামারীস্থ বধ্যভূমিতে প্রতিদিন যে গণহত্যা সংগঠিত হয় খুলনা বেতার তার নীরব সাক্ষী। গল্লামারী বেতার ভবনের পুলিশ ব্যারাক পাকিস্তানী সৈন্যরা দখল করে নিয়ে সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করে আশপাশের গ্রামগুলি জ্বালিয়ে দেয় এবং নিরীহ লোকজনদের ধরে এনে কাছেই বদ্ধভূমিতে জবাই করে হত্যা করতে থাকে। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের গ্লানিকর পরাজয়ের মুখে গলামারীস্থ বেতার ভবনে অবরুদ্ধ পাকিস্তানী সৈন্যরা বেতারের সব যন্ত্রপাতি ও সমস্ত টেপ বিনষ্ট করে দেয় এবং বেতারের ক্যাশ ভেঙ্গে টাকা পয়সা চুরি করে নিয়ে যায়।

                রংপুর কেন্দ্র থেকে ১ কিলোওয়াট শক্তি সম্পন্ন একটি ট্রান্সমিটার এনে সংস্থাপনের ফলে ১৯৭৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে পুনরায় শুরু হলো ঢাকা থেকে অনুষ্ঠান সম্প্রচার। বেতার কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে ১৯৭৩ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে পঞ্চান্ন মিনিটের নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। এর কিছু দিন পরে পঞ্চান্ন মিনিট থেকে নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচারের সময়সীমা চার ঘন্টায় উন্নীত করা হয় এবং এ সময় অনুষ্ঠানের শ্রুতি-পরিধি ছিল কেবল মাত্র ১০ মাইলের মধ্যেই । ১৯৭৪-৭৫ সালে ১০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন একটি ট্রান্সমিটার সংস্থাপনের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৬ সালের ১৯ শে এপ্রিল-এর মাধ্যমে প্রচার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রুতি-পরিধি বেড়ে ৩৫ মাইল হয়। কিন্তু তখন পর্যন্ত প্রচার ভবন নির্মিত হয়নি, যার ফলে কর্মী, কথক-শিল্পী এবং প্রকৌশলীদের প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। এই অবস্থার নিরসনকল্পে বয়রায় একটি সর্বাধুনিক ব্রডকাস্টিং হাউজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়।

                                ১লা জুলাই ’৭৯ তারিখে ৪টি স্টুডিও সম্বলিত নতুন প্রচার-ভবন থেকে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। এটি হচ্ছে রেডিও বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বপ্রথম নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ বেতার ভবন।

                ১৯৮১ সালের ২৮ শে এপ্রিল ১০০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন ট্রান্সমিটার নওয়াপাড়ায় স্থাপিত হওয়ায় এ কেন্দ্রের শ্রুতির পরিধি প্রায় সমগ্র বাংলাদেশ ছড়িয়ে পড়ে আর সাথে সাথে বেড়ে অনুষ্ঠান প্রচারের সময়সীমা। বর্তমানে প্রতিদিন মধ্যম ও এফ.এম তরঙ্গে ৫০ ঘন্টা ৫০ মিনিট অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে।

 

 

                বর্তমানে খুলনা বেতার নির্মাণ করে চলছে বৈচিত্র্যময় সব অনুষ্ঠানমালা। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা বোধে উজ্জ্বীবিত করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠান স্বাধীনতা আমার অহংকার,  প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পর্যালোচনা নিয়ে অনুষ্ঠান আজকের সংবাদপত্র ছাড়াও রয়েছে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ব্রান্ডিং অনুষ্ঠান “ শেখ হাসিনার দশ উদ্দ্যোগ ” ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশ ।ইতিহাসের সাক্ষী খুলনা বেতার ধারন করে আছে খুলনা বেতারকে পাকিস্তানী সৈন্যদের দখলমুক্ত করার উদ্দেশ্যে সংগঠিত প্রতিরোধ যুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্থাপিত স্বাধীনতা মঞ্চ ও জাতির জনকের স্মৃতি ভাস্কর্য। বর্তমানে এ স্মৃতি ভাস্কর্যের সম্প্রসারন কাজ এগিয়ে চলছে।

উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানসমূহ:

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠান: মুক্তির সৈনিক, একাত্তরের চিঠি, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, কথা ও ছন্দ, হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আমার অহঙ্কার।

অন্যান্য অনুষ্ঠান:

 প্রভাতী ম্যাগাজিন: দৃষ্টিপাত, ধর্মীয় ম্যাগাজিন: সিরাতুল মুস্তাকিম, স্বাস্থ্য-বিষয়ক অনুষ্ঠান: স্বাস্থ্য বিচিত্রা, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক অনুষ্ঠান: ছোট পরিবার, কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান: চাষাবাদ, শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান: কিশোর মেলা, যুব শ্রেণির জন্য অনুষ্ঠান: যুব সম্ভার, মহিলাদের জন্য অনুষ্ঠান: ঘরোয়া, স্বাস্থ্য ও কৃষিবিষয়ক ফোন-ইন-প্রোগ্রাম এছাড়াও বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন, সঙ্গীত ও নাটক প্রচারিত হয়ে থাকে।

বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ অনুযায়ী সদর দপ্তর কর্তৃক প্রেরিত দিক নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা, জীবন্তিকা, জারি গান, কথিকা, শ্লোগান, স্পট, জিঙ্গেল প্রচারিত হচ্ছে।

অধিবেশন: ২টি

মোট প্রচার সময়: এ.এম. ৫৩৭.৬৩ মিটার বা ৫৫৮ কিলোহার্জ 

১ম অধিবেশন ঃ সকাল ৬-৩০ মিনিট থেকে সকাল ১০-০০টা পর্যন্ত।

২য় অধিবেশন ঃ বেলা ১১-৫৯ মিনিট থেকে রাত ১১-১৫ মিনিট পর্যন্ত

মোট: ১৫ ঘন্টা ১৫ মিনিট।

এফ.এম ৮৮.৮ মেগাহার্জ

১ম অধিবেশন ঃ সকাল ৬-০০ মিনিট থেকে দুপুর ১-০০ টা পর্যন্ত।

২য় অধিবেশন ঃ এফ.এম ৮৮.৮ মেগাহার্জ সন্ধ্যা ৭-০০ মিনিট থেকে রাত ১১-১৫ মি. পর্যন্ত।

এফ.এম ১০২ মেগাহার্জ

১ম অধিবেশন ঃ সকাল ৬.৩০ মিনিট থেকে সকাল ১০.০০টা পর্যন্ত।

২য় অধিবেশন ঃ দুপুর ২.৩০ মিনিট থেকে রাত ১১.১৫ মি. পর্যন্ত।

এফ.এম ৮৮.৮ মেগাহার্জ (বিবিসি)

সকাল ৬.৩০ মিনিট থেকে ৭.০০টা ৭.৩০ মিনিট থেকে ৮.০০টা পর্যন্ত

সন্ধ্যা  ৭.৩০ মিনিট থেকে ৮.০০টা রাত ১০.৩০ মিনিট থেকে রাত ১১.০০ টা পর্যন্ত

এন এইচ কে ঃ রাত ৯.০০-৯.৪৫ মিনিট পর্যন্ত

এফ.এম ১০০.৮ মেগাহার্জ

১ম অধিবেশন ঃ সকাল ৬.০০ মি. থেকে সকাল ১০.০০ টা পর্যন্ত

২য় অধিবেশন ঃ দুপুর ২.৩০ মি. থেকে রাত ১১.১৫ মি. পর্যন্ত

এফ.এম ৯০ মেগাহার্জ

সন্ধ্যা ৭.৩০ মি. থেকে রাত ১১.০০ টা পর্যন্ত।

প্রতি শুক্রবার সকাল ১০.১৫ মি. থেকে সকাল ১১.২০ মি. পর্যন্ত।

মোট ঃ ৩৫ ঘন্টা ৩৫ মি. 

এ.এম ও এফ.এম মোট প্রচার সময় ৫০ ঘন্টা ৫০ মিনিট।

    ভৌত অবকাঠামো:

স্টুডিও সংখ্যা # ৪ টি

প্রেরণ যন্ত্র: এ.এম ট্রান্সমিটার ১০০ কি:ও: ও এফ.এম ১০ কি:ও: (নওয়াপাড়া)

এফ.এম- ৪টি (প্রচার ভবন, খুলনা)

ট্রান্সমিটার সংখ্যা # ৬টি এ.এম-১টি ১০০ কি:ও:, এফ.এম- ০৫টি ক) ৮৮.৮ মেগাহার্জ- ১০ কি:ও:, খ) ৯০ মেগাহার্জ, ০৫ কি:ও:, গ) ১০০.৮ মেগাহার্জ- ১০ কি:ও:, ঘ) ১০২ মেগাহার্জ- ১ কি:ও: ঙ) ১০৭.৮ মেগাহার্জ- ৫০০ ওয়াট এছাড়া লিঙ্ক ৮৫০.৫০ মেগাহার্জ- ১৫ ওয়াট।  

   ৩.  বার্তা বিভাগ:

প্রচারিত সংবাদ: দৈনিক ৫টি বাংলা ও ১টি ইংরেজিসহ মোট ৬টি সংবাদ বুলেটিন।

প্রচার সময়: সকাল ৮-১০ বাংলা, সকাল ১০.০০ বাংলা, দুপুর ১২-১০ বাংলা, বিকাল ৪.০৫ মি বাংলা সন্ধ্যা ৬-০৫ ইংরেজি এবং সন্ধ্যা ৭-০০ বাংলা।

মোট প্রচার সময়: ৩০ মিনিট (প্রতিটি বুলেটিন ৫ মিনিট করে)।

এছাড়াও জাতীয় সংবাদ ঢাকা থেকে রিলে করা হয়।

 

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :

Facebook Twitter